চিলেকোঠার ঘর
চ্যাটচেটে হলুদ দুপুরের ওপর দিয়ে হাঁটছে মেয়েটা আর ছেলেটা। দুজনেই ফার্স্ট ইয়ার। একজনের সাবজেক্ট সংস্কৃত, আরেকজনের অঙ্ক। ফুচকাওয়ালা, শাহরুখ খানের পোস্টার, বাচ্চা কাকের এক তার থেকে আরেক তারে উড়ে যাওয়া, টিউবওয়েলের জল, অচেনা মানুষের হম্বিতম্বি টিটকিরিতে চোবানো কলেজ কাট মারা আলগোছের দুপুরগুলো যেমন হয় আর কী! পকেটে দুজনের কারও তেমন পয়সা নেই। থাকার মধ্যে রয়েছে ওই হেঁটে যাওয়াটুকু। অনেক রাস্তা, পাহাড়, নদী, পার্টি অফিস, কানা গলি, নরেনের মিষ্টির দোকানকে পাশে রেখে এগোতে এগোতে দেখা পাওয়া গেল এক নির্মীয়মাণ বাড়ির। তিনতলা বাড়ি হচ্ছে। প্রায় পুরো কাজই শেষ। এখন শুধু রং হচ্ছে। অদ্ভুত সুন্দর এক রং। ছেলেটা রঙের নাম জানে না। মেয়েটা উচ্চারণটা জানে না। একটা আলুকাবলি দুজনে মিলে ভাগ করে খেতে খেতে ব্যাপারটা হাঁ করে দেখছিল ওরা। সবে পাঁচদিন হল ওদের এই সম্পর্কের বয়স। ছেলেটি বক্তিয়ার। মেয়েটি ততোধিক লাজুক। পাঁচদিন আগে ছেলেটির প্রশ্নের জবাবে মেয়েটি তাই তার কড়ে আঙুলের ডগাটুকু ধরতে পেরেছিল খালি। চলন্ত অটোর ভেতরে ঘটেছিল গোটা ঘটনা। মেয়েটার আঙুল তার আঙুলকে ছোঁয়ার পর পাগলের মতো হেসে যাচ্ছিল ছেলেটা। মন দিয়ে হেসে যাচ্ছিল। বাকি যাত্রীদের ‘অটো:কিম'-পোজকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে। মফসসলের রাস্তা তখন নিজস্ব প্যাচপঁয়জার নিয়ে উঠে যাচ্ছিল নারকোল গাছের মাথায়।
ওদের পাশ দিয়ে কয়েকজন মিলে একটা দরজা নিয়ে গেল। ধরাধরি করে। নতুন বাড়িতে বসবে। সদর দরজা। বাড়ির রংটার সঙ্গে অসামান্য মানিয়েছে দরজাটা। দরজার গায়ে লেখা –‘অভিবাদন'। মেয়েটা বেশি কথা- টথা বলে না। বললেও খুব ইনিয়ে বিনিয়ে। সব সময় কেমন একটা ভয়। তবে খানিক ধাতস্থ হওয়ার পর এক লপ্তে বেশ খানিকটা বলে দিতে পারে।
আচ্ছা, একটা কথা বলব? মেয়েটি জিজ্ঞাসা করল।
হ্যাঁ, বল। বলবি না কেন!
আমাদের এরকম বাড়ি হলে খুব ভাল হয়, না! রংটাও এরকমই হবে।
হুম।
আমি কি খুব ভুল বললাম বা বেশি বলে ফেললাম?
না না ঠিক আছে। প্রেমের প্রথম দিকে তো এরকমই কথা হয়। আমার বন্ধুরাও বলে শুনেছি!
ও। আচ্ছা!
রেগে গেলি নাকি রে! এই ঝুনু!
না। একদমই না।
তাহলে তো হেবি রেগেছিস! আরে আমি তো পাতি ইয়ার্কি মারছিলাম। হবে, নিশ্চয়ই হবে
এরকম বাড়ি।
দরজার গায়ে কী লেখা হবে তাহলে?
দরজার গায়ে, মানে?
ওই যে, ওরা যেমন ‘অভিবাদন' লিখেছে!
এটা তুই বল, প্লিজ। আমার তো কিছুই আসছে না আপাতত মাথায়।
থাক। কিছুই লেখার দরকার নেই। দরজার ওপর এভাবে লিখে রাখাটা কোনও কাজের কথা নয়। দরজাটা বানানো কীসের জন্য? দরজা মানে কী? একটা দেওয়াল টেওয়াল তুলে দিয়ে বাইরের আলোর ভেতরে ঢোকার চিলতে পাসপোর্ট। বরং, এমন যদি হয়, আমাদের ঘরগুলোতে কোনও দরজা থাকবে না! তাহলে?
এরকম কথা তো কবি টবি'রা বলে রে! দরজা না থাকার কী আছে? যাব্বাবা! সে রকম আবার
হয় নাকি! ঠিক আছে। আপাতত এসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই। তার চেয়ে হাঁটাই ভাল। তোর
কাছে কত টাকা আছে রে?
পনেরো।
আমার কাছে সাত। একটা ভেজ চাউ খাবি? দুজনের টাকা মিলিয়ে হয়ে যাবে। খুব খিদে
পেয়েছে…..
মধ্যবিত্ত বাড়ির সন্তান দুজনেই। ছেলেটির একটা পুরনো সাইকেল ছিল। হিরো জেট। সেটা থেকে আবার অদ্ভুত সব ক্যাঁচোরম্যাচোর আওয়াজ বেরোত একটু জোরে প্যাডেল করলেই। মেয়েটিকে সামনে বসিয়ে অনেক রাস্তা পেরিয়ে যেত সে নির্দ্ধিধার স্লো-মোশনে। জেট-এ জেট-এ পথে হল দেরি। প্রেমটা হওয়ার পর ছেলেটি লেখালেখি আরম্ভ করেছিল। বিভিন্ন কাগজ ম্যাগাজিন টিনে পাঠাত সে সব লেখা। হাতের লেখা অসম্ভব বাজে বলে পুরোটাই কপি করে দিত মেয়েটি। তথাকথিত শারীরিক সম্পর্ক বলতে যা বোঝায়, তা ওদের মধ্যে কখনও হয়নি। মাঝে মাঝে পার্কে টার্কে যেত, প্রিন্সেপ ঘাট…
মেয়েটি চুমু খাওয়ার সময় আড়ষ্ট হয়ে যেত। মাংস মাংস লাগত। ছেলেটি বলত, বিয়ের আগে একবার
হনিমুনে চল না ঝুনু! ….
প্লিজ বিয়ের পরে যা খুশি করিস। এখন নয়। এখন যা হবে সব উপর উপর। বিয়ের পর একটুও বারণ করব না। সত্যি বলছি, বিশ্বাস কর।
এতটা অবধি বলে মেয়েটি একটা অদ্ভুত ভঙ্গীতে মাথাটা নাড়িয়ে যেত। ভাল করে তেল দিয়ে টেনে বাঁধা
চুল। মুখে অল্প ব্রন। ছেলেটি একভাবে তাকিয়ে থাকত ওর দিকে। এক অপার মুগ্ধতাবোধ শরীরের ভেতরের পিত্ত, চর্বি, আঁট হয়ে থাকা মাংসের ওপর দিয়ে দু'বছর তিন মাসের শিশু হয়ে ডিগবাজি খেতে খেতে বেরিয়ে যেত। বাতাসার মতো একটা গন্ধ এলিয়ে পড়ে ঝাঁকিয়ে দিত চারপাশ। এরকম একটা সময়েই--- ছেলেটির বিশ্বাস ছিল---ধানে দুধ আসে, পুকুরের ঝাঁক বাঁধা সরপুটি বাঁক নেয় ডানদিক থেকে বাঁয়ে, এফএম-এ আচমকা বেজে ওঠে মৌসুমী ভৌমিকের গান...
দিন যায়। আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির হিসাবটা চলতে থাকে ভূগোলের সিলেবাস মেনে। নতুন
রোদ এসে তুলে নেয় বাসি ধুলো। বয়স বাড়ে।
মেয়েটির বাবা এক ফ্যান তৈরির কারখানায় কাজ করত। মাইনেপত্তর ছিল ভালই। ওদের কলেজ জীবনের শেষের দিক নাগাদ ভদ্রলোকের পরপর দু'বার স্ট্রোক হয়ে ডানদিকটা সম্পূর্ণ পড়ে যায়। চাকরি চলে যায়। হাতে পাওয়া সমস্ত টাকা শেষ হয়ে যায় মোটামুটি পাঁচমাসের মাথায়। ফাইনাল ইয়ারটা আর দেওয়া হয় না মেয়েটির। মেয়েটি টিউশন করত। মূলত ওই টাকাতেই সংসার চলত ওদের। ফিজিওথেরাপি শিখতে আরম্ভ করে এরপর সে। তার জামাইবাবু বলেছে ওটা ভাল করে শিখে নিতে পারলে ফিউচার নিয়ে আর কোনও চিন্তা নেই। প্রচুর পয়সা! মেয়েটি ছেলেটিকে বলত এ সব। কেমনভাবে ওদের ইনস্টিটিউটের স্যার ফিজিওথেরাপি শেখানোর সময় আলতো করে আচমকা হাতটা বুলিয়ে দিত বুকের ওপর দিয়ে, বলত সে সবও। ছেলেটি লক্ষ করত কথাগুলো বলার সময় মেয়েটার চোখের ভেতরের তিন টাকা দামের গুলিটা ভস করে টাটিয়ে উঠত মরা বোয়ালের মতো। মুখে ভকভক করত পাইরিয়ার গন্ধ। ছেলেটি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকত। মাঝে মাঝে তাকাত মেয়েটির দিকে। মেয়েটি কথা বলে যেত একমনে। ক্লাস থ্রি-এর স্টুডেন্টের মা লইট্যা মাছের বড়াটায় অত দারুণ এসেন্স আনা সত্ত্বেও ওকে দুটোর বেশি দিল না- তখন হয়তো সে রয়েছে এই জায়গাটায়….
চাকরি এবং মোবাইল প্রায় একসঙ্গে হয় ছেলেটির। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, সিসিডি, হোয়্যাটসঅ্যাপও হয়। শ্রমণা, অদিতি, পামোলি, নবনীতা… এরকম নামের কিছু বান্ধবী থাকলে এই সময় ভাল দেখায়। তাই, তারাও আসে তার জীবনে। তাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয় রাতের পর রাত। এসব ক্ষেত্রে যেমন হয় টয় আর কী! তারা ওকে গান শোনায়, বাহোঁ মে চলি আ… কেউ বা, ফরাসি ভাষায় রবীন্দ্রসঙ্গীত। টিউশন আর ফিজিওথেরাপির জীবনে মাথা গুঁজে পড়ে থাকে অন্যজন। মুখ ভর্তি পাইরিয়া নিয়ে সারাদিনের গল্প করার জন্য ফোন করে প্রতি রাতে পেতে থাকে এক তুমুল হাস্কি ভয়েসকে। দ্য নাম্বার ইউ আর কলিং ইজ বিজি রাইট নাউ…
দূরত্ব বাড়তে থাকে।
এরকমই এক সময় ছেলেটি একদিন জানায় এই সম্পর্কে থাকা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। সে অদিতির প্রেমে পড়েছে। ইফ এভরিথিং গোজ ফাইন তাহলে ওরা বিয়েও করে নেবে তাড়াতাড়ি। বেঙ্গলিশ ভাষার ব্যবহার অত্যধিক বেড়ে যাওয়া নিয়ে কাগজ- টাগজে অনেক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পড়েছে মেয়েটি এতদিন। কিন্তু সে ভাষা যে আদতে এতটা জঘন্য হতে পারে তা টের পেল এই প্রথমবার। সে চুপ করে থাকে। হাওয়া দেয় জোরে, পাতারা কাঁপে তিরতির করে।
তারপর দুজনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আর কোনও যোগাযোগ থাকে না। অদিতির সঙ্গে প্রেম চলতে থাকে ছেলেটার। চুমুটা খুব ভাল খায় অদিতি। যে কোনও জায়গায় যখন তখন। তুমুল স্মার্ট। শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারেও খুব উত্সাহ। কিন্তু ঠিকঠাক জায়গা না পাওয়ার জন্য হচ্ছিল না। পার্কে হয়। কিছুদিন আগেই এক কফিশপে একটা কাপুচিনো দুজন মিলে খেতে খেতে স্মুচ করে কেস খেয়েছিল। কিন্তু এ সবে আঁশ তো মেটে না তেমন। আর হোটেল বা রিসর্টের ব্যাপারে ওদের দুজনেরই আপত্তি আছে। সে যাক গে, অবশেষে সুযোগ পাওয়া গেল। অদিতির এক বন্ধুর বাড়িতে। কিন্তু ঘরে নয়। ছাদের চিলেকোঠায়! নীচের ঘরগুলো আরও অনেক বন্ধু আগে থেকেই ‘বুক' করে নিয়েছে!
চিলেকোঠার ঘর নামেই। অদিতির বন্ধুর স্বাধীনতা সংগ্রামী দাদুর আমলে বানানো এই স্থাপত্যটি বেসিক্যালি এখন পড়ে আছে হাড়-পাঁজরা নিয়ে। মাথার শেডটা আছে শুধু। দেওয়াল-টেওয়ালও ভাঙা। প্লাস্টার খসে পড়েছে। দরজা নেই। তার জায়গায় একটা মশারি হয়ে যাওয়া পর্দা ঝুলছে শুধু। অন্ধকারে অদিতির বড় কোমরকে বেড় দিয়ে টেনে নেয় ছেলেটি। আমাদের প্রথম হনিমুন- এটুকু বলে অদিতির গলা জড়িয়ে গেল। দুজনের শরীর অবশ হয়ে মিশে যেতে থাকে আধপোড়া ঘামের গন্ধের মধ্যে। কিছু জোনাকি উড়ে বেড়াতে থাকে শুয়ে থাকা দুই মানুষকে কেন্দ্র করে। মরা মানুষের মুখের ভেতরের হাঁ-এর মতো সেই অন্ধকারে উত্সব বলতে ওই জোনাকির আলোটুকুই। জোনাকি ঘুরতে থাকে দুজনের শরীরের উপর দিয়ে। ছেলেটি থেমে যায় এই সময়। বাইরে হাওয়া দিচ্ছে অল্প। মশারির মতো পর্দাটা নাচ করছে তাতে। তার গায়ে আঁট হয়ে গিয়ে দোল খাচ্ছে বছর ছয়েক আগের এক দুপুরও। জোনাকির আলোতে এসে যাচ্ছে- আলুকাবলি ভাগ করে খাওয়ার নির্বিকার হাঁটাচলা, নির্মীয়মাণ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রনয় মুখভর্তি হয়ে যাওয়া মেয়েটি- মাঝেমাঝে ঘড়ি দেখছে, জেট-এ জেট-এ পথে হল দেরি, দুজনের টাকা মিলিয়ে একটা ভেজ চাউ হয়ে যাবে রে…
ছেলেটি জোরে জোরে নাড়াতে থাকে অদিতির শরীরটাকে হঠাৎ। পাগলের মতো। ঝুনু, এই ঝুনু! একবার ওঠ! দেখ, আমরা ওই ঘরটায় এসেছি! ওই ঘরটায়… যেখানে কোনও দরজা নেই। তুই চেয়েছিলি না! দেখ না একবার ঝুনু! প্লিজ!
২
দুটো মানুষ মাটির ডেলা হয়ে যায় এরপর। ভূগোলের সিলেবাস মেনেই পৃথিবী ঘুরতে থাকে। কোথাও কোনও ময়লা পড়ে না। কোথাও কোনও চাক্কা জ্যাম হয় না।